এসটিআই বা যৌনরোগ
A. এসটিআই বা যৌনরোগ কি?
সাধারণত যৌনরোগ বলতে যৌনমিলনের
মাধ্যমে ছড়িয়ে পরা সংক্রমণকেই
বুঝায়। কয়েক ধরনের
রোগ আছে যা প্রধানত
যৌন মিলনের মাধ্যমেই একজন
থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়ায়।
এই রোগগুলো বিভিন্ন ধরনের জীবাণু যেমন-ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস, প্রোটোজোয়া ইত্যাদির আক্রমণে হয়ে থাকে।
যে জীবানুসমূহ যৌনবাহিত সংক্রমনের জন্য দায়ীঃ
ব্যাকটেরিয়াঃ
- নাইশেরিয়া
গনোরিয়া (Neisseria
gonorrhoeae),
- ক্ল্যামাইডিয়া ট্রাকোম্যাটিস (Chlamydia trachomatis),
- ট্রিপোনেমা
প্যালাইডাম (সিফিলিস) (Treponema pallidum),
-
হিমোফাইলাস
ডুকরি (শ্যানক্রয়েড) (Haemophilus
ducreyi),
- ক্ল্যাবশেলা গ্র্যানোলোমেটিস (ডুনোভেনোসিস) (Klebsiella granulomatis)
প্রোটোজোয়াল এজেন্টঃ
- অ্যানটামাইবা
হিসটোলাইটিকা (Entamoeaba
histolytica),
- জিয়ারডিয়া ল্যামবি¬য়া (Giardia lamblia),
- ট্রাইকোমোনাস
ভেজাইনালিস (Trichomonas
vaginalis)
l
ভাইরাল এজেন্টঃ
- হারপিস
সিমপ¬্যাক্স - ১ ও ২
(Herpes
simplex virus -1 & 2),
-
হেপাটাইটিস
(hepatitis
B virus),
- হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (Human papillomavirus),
- মোলাসকাম
কনটাজিওসাম ভাইরাস (Molluscum contagiosum
virus),
- এইচ আই ভি - ১ ও ২ (HIV – 1 & 2)
ফাংগাস :
- ক্যানডিডা
এ্যালবিকানস (Candida
albicans)
l
এ্যাকটো প্যারাসাইটসঃ
- থাইরাস
পিউবিস (পিউবিক উকুন) (Pthiris pubis),
-
সারকোপটিস
স্ক্যাবি (Sarcoptes
scabiei)
b.যৌনরোগ কি কি?
বিশেষ কয়েকটি যৌনরোগ,
যেমন-
- গনোরিয়া
- সিফিলিস
- ক্ল্যামাইডিয়া
- ট্রাইকোমোনিয়াসিস
- হারপিস জেনিটালিয়া
- শ্যাংক্রয়েড
- এইচআইভি এইডস
- হেপাটাইটিস বি, সি
c.যৌনরোগ কিভাবে ছড়াঁয়?
যৌনরোগের জীবাণু নিম্নলিখিত উপায়ে
ছড়ায়
- অনিরাপদ যৌনমিলনের মাধ্যমে
- সংক্রমিত মা থেকে শিশুতে ছড়ায়- গর্ভকালীন সময়, প্রসবের সময় ও শিশু জন্মের পর
- রক্তদানের মাধ্যমে (যেমন- সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত যদি কোন জরুরি অবস্থায় পরীক্ষা ব্যতীত অন্যের শরীরে দেয়া হয়), টিস্যু বা শরীরের কোন অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে (একজন সংক্রমিত মানুষের কিডনী, চোখ বা অন্য আরেকজনের দেহে প্রতিস্থাপন করলে)
- সংক্রমিত সূচঁ, সিরিঞ্জ, মেডিকেল যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য ধারালো যন্ত্রপাতির মাধ্যমে
d. মুখের যৌনরোগ (ওরাল STI)
মুখের যৌনরোগ কি?
মুখে যৌনকাজের মাধ্যমে
যে যৌনরোগ ছড়ায় তাকে
মুখের যৌনরোগ বা ওরাল
STI বলে।
মুখে যৌনকাজ বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা:
মুখে যৌনকাজ সম্পর্কে
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো
যে, এটি অপেক্ষাকৃত কম
ঝুকিপূর্ণ অর্থাৎ মুখে যৌনকাজ
করলে এইচআইভি সহ অন্যান্য যৌনরোগ
ছড়ানোর সম্ভাবনা কম। এ
ধারণা সঠিক নয়।
সঠিক তথ্য হল
মুখে অনিরাপদ যৌন কাজের মাধ্যমে
পায়ুপথ বা যৌনাঙ্গের মত
মুখেও যৌনরোগ
হতে পারে। সাম্প্রতিক
গবেষণা থেকে জানা যায়
যে, ঝুকিপূর্ণ জনগোষ্ঠির মধ্যে মুখে যৌন
রোগের হার অধিক।
মুখের যৌনরোগ কিভাবে ছড়ায় ?
অনিরাপদ যৌন কাজের মাধ্যমে
পায়ুপথ বা যৌনাঙ্গের মত
মুখেও যৌনরোগ হতে পারে।
যৌন সঙ্গীদের মধ্যে
একজনের যদি পুরুষাঙ্গে ইতিপূবেই
যৌনরোগ থাকে, তবে মুখে
যৌনকাজের মাধ্যমে অন্য সঙ্গীর মুখে
যৌনরোগ হতে পারে।
প্রসঙ্গত একইভাবে মুখের যৌনরোগ অন্য
সঙ্গীর পুরুষাঙ্গেও সংক্রমিত হতে পারে।
এ ধরনের যৌন
কাজের সময় আক্রান্ত ব্যক্তির
কামরস, বীর্য, যোনীরস মুখে
প্রবেশ করতে পারে যার
মাধ্যমে মুখে যৌনরোগ সংক্রমিত
হতে পারে।
মুখের যৌনরোগের চিহ্ন বা লক্ষণ:
সাধারনত বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মুখের যৌনরোগের কোন
চিহ্ন বা লক্ষণ প্রকাশ
পায় না, ফলে আক্রান্ত
ব্যাক্তি তার সংক্রমণের অবস্থা বুঝতে
পারেনা। তবে কিছু
কিছু ক্ষেত্রে নি¤œলিখিত লক্ষনসমূহ
দেখা যেতে পারে, যেমন:
- মুখের ভেতর ঘা/ ক্ষত
- গলায় ঘা/ ক্ষত
- টনসিলে
ব্যথা
মুখে যৌনকাজের মাধ্যমে যে সকল যৌনরোগ ছড়ায়:
·
হার্পিস
·
গনোরিয়া
·
সিফিলিস
·
ক্ল্যামাইডিয়া
·
এইচআইভি
· হেপাটাইটিস
এ, বি ও সি
মুখের যৌনরোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব:
দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করলে এটি
স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির
কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ
¯œায়ুবিক সিফিলিস, এইচআইভি সংক্রমণের বাড়তি ঝুঁঁকি, মানসিক
অস্বস্তি ইত্যাদি
দেখা দিতে পারে।
মুখে যৌন রোগের প্রতিকারঃ
মুখের যৌন রোগ
নিরাময়যোগ্য। অন্যান্য স্থানের
যৌনরোগের মত একই ঔষধ
দ্বারা মুখের যৌন রোগেরও
চিকিৎসা করা সম্ভব যদি
সঠিক সময়ে নির্ণয় করা
যায়। তাই শারীরিক
পরীক্ষার সময় নিয়মিতভাবে ডিসপোজেবল
টাং ডিপ্রেসর এর দ্বারা ওরো-ফ্যারেনজিয়াল পরীক্ষা করে ঠোঁট, মাড়ি,
মুখগহ্বর অথবা ফ্যারিংক্সে কোন
যন্ত্রণাবিহীন ক্ষত, পানিপূর্ণ ফোস্কা,
পূঁজ নির্গমন অথবা ক্ষত আছে
কিনা তা পরীক্ষা করা
উচিৎ।
মুখের যৌনরোগ প্রতিরোধের উপায়:
- মুখে যৌনকাজে সবসময় সঠিকভাবে কনডম ব্যবহার করা।
- মুখে যৌনকাজের সময় দাঁত বন্ধনী/ডেন্টাল ড্যাম ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে তা এখনও বাজারে সহজলভ্য নয়।
e. যৌনরোগের লক্ষণ
মেয়েদের ক্ষেত্রে
ছেলেদের ক্ষেত্রে
উভয়ের ক্ষেত্রে
- তলপেটে ব্যথা
- অতিরিক্ত গন্ধযুক্ত স্রাব
-
যৌনমিলনের সময় ব্যথা পাওয়া
- প্রস্রাবের সময় ব্যথা ও জ্বালাপোড়া
- অন্ডকোষ ফোলা ও ব্যথা
- কুঁচকি ফোলা ও ক্ষত
- মূত্রনালীর নি:সরণ
- যৌনাঙ্গে ক্ষত হওয়া (ব্যথাযুক্ত ও ব্যথামুক্ত)
- যৌনাঙ্গ হতে পুঁজ পড়া
- পায়ুপথ থেকে পুঁজ পড়া
- হাত ও পায়ের পাতাসহ শরীরে ফুসকুড়ি
f.
এস. টি. আই (STI) র জন্য যারা ঝুঁকিপূর্ণ:
- যারা সুঁচের মাধ্যমে মাদক গ্রহন করে
- সমকামী পুরুষ
- পুরুষ যৌন কর্মী
- হিজড়া (ট্র্যান্সজেন্ডার)
- মহিলা যৌন কর্মী (পতিতালয়ের যৌন কর্মী, হোটেল বেইজড যৌন কর্মী, স্ট্রীট-বেইজড যৗন কর্মী, রেসিডেন্স বেইজড যৌন কর্মী)
g.
যৌনরোগের এর ফলাফল:
- জনন অঙ্গে সৃষ্ট ক্ষতসমূহ এইচআইভি ভাইরাস আক্রমণ ও সংক্রমনের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে
- দীর্ঘ মেয়াদী সিফিলিস (late syphilis)-এ পরবর্তীতে দেহের স্নায়ুতন্ত্র ও হৃৎপিন্ডকে আক্রমণ করে নিউরো ও কার্ডিয়োভাস্কুলার সিফিলিস সৃষ্টি করে
- প্রজনন ক্ষমতা কমে যায় বা বন্ধ্যাত্ব দেখা দেয়
- নবজাতকের চোখে সংক্রমণ অথবা নিউমোনিয়া হতে পারে
- মহিলা সঙ্গী ভুক্তভোগী হয় - জরায়ুর মুখে সংক্রমন, বন্ধ্যা বা জরায়ুর বাইরে গর্ভধারন
- যৌনবাহিত
সংক্রমনে গর্ভের সন্তানও সংক্রমিত
হতে পারে - যা অকালে
সন্তান প্রসব, মৃত সন্তান
প্রসব এবং শিশুর জন্মগত
সিফিলিসের মতো জটিলতাসমূহ তৈরী
করে
- জনন
অঙ্গের গোদরোগ; মুত্রনালী
সংকুচিত হয়ে যাওয়া এসব
সমস্যা দেখা দিতে পারে
h.
কেন এস. টি. আই (STI) গুরুত্বপূর্ণ ?
- এস. টি. আই (STI) থাকলে এইচ. আই. ভি (HIV) সংক্রমনের ঝূঁকি বৃদ্ধি পায়
- এস.
টি. আই (STI) -তে
আক্রান্ত পুরুষ, মহিলা ও
বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সঠিক চিকিৎসার অভাবে
মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি হয়
i.
প্রতিরোধ (Prevention):
সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর
জন্য আচরনগত পরিবর্তনই হচ্ছে
প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায়। তাই যৌনসঙ্গী
কমানো এবং প্রতিবার যৌনমিলনে
সঠিক নিয়মে কনডম ব্যবহরের
উপর জোর
দেওয়া উচিত। যাদেরযৌনবাহিত
সংক্রমণ আছে তারা সকলেই এইচআইভির ঝুঁকির মধ্যেও রয়েছে যেহেতু যৌনবাহিত সংক্রমণ এইচআইভির
সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।এজন্য এ ধরনের সবরোগীদেরই এইচআইভি পরীক্ষার আওতায় আনা উচিত
। যাদের একবার যৌনবাহিত সংক্রমণ হয়েছে তাদের অবশ্যই জানতে হবে কিভাবে ভবিষ্যতের সংক্রমণ
প্রতিরোধ করা যায়। এই উদ্দেশ্যে নিচে চারটি স্বাস্থ্য নীতি (৪ঈং) উপস্থাপন করা হল;
যেমন: সম্পূর্ণ চিকিৎসা গ্রহণ ; প্রতিরোধের জন্য কাউন্সেলিং বা পরামর্শদান; কনডমের
সঠিক এবং ধারাবাহিক ব্যবহার -; এবং সঙ্গী চিহ্নিতকরণ
এবং চিকিৎসা প্রদান ( সঙ্গীর ব্যবস্থাপনা/ পার্টনার ম্যানেজমেন্ট)।
সম্পূর্ণ চিকিৎসা গ্রহন (Compliance with treatment): যৌনরোগীকে অবশ্যই চিকিৎসাপত্র (প্রেশক্রিপশন) অনুযায়ী চিকিৎসা মেনে চলার জন্য উৎসাহিত করতে হবে।
- রোগীকে চিকিৎসার সম্পূর্ণ কোর্স পূর্ণ করার জন্য নিদের্শ দিতে হবে।
- চিকিৎসা চলাকালীন উপসর্গসমূহ লোপ পাওয়ামানে এই নয় যে রোগী সম্পূর্ণরূপে নিরাময় হয়েছে।
- সঠিক এবং সম্পূর্ণ চিকিৎসা ছাড়া যৌনবাহিত সংক্রমণ মারাতœক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
- চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে ও সঙ্গীর চিকিৎসা না হওয়া পর্যন্ত এবং সম্পূর্ন নিরাময় না হওয়া পর্যন্ত রোগীকে যৌন সংস্পর্শ থেকে বিরত থাকা উচিত।
- পরবর্তী ফলো-আপ ভিজিট নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিরোধের জন্য কাউন্সেলিং বা পরামর্শদান: যৌনবাহিত সংক্রমণের উপসর্গ বিদ্যমান এমন প্রত্যেক রোগীকেই যৌনরোগের প্রাসঙ্গিক শিক্ষামূলক বার্তা দিতে হবে।
- অনিরাপদ যৌন সংর্স্পশ/ সর্ম্পক থেকে যৌনবাহিত সংক্রমণ হয়
- নিরাপদ যৌন চর্চা এবং কনডম ব্যবহারের বার্তা/তথ্য দেওয়া।
- এইচআইভি সহ যৌনবাহিত সংক্রমণ সংক্রামিত হওয়ার উপায় বলা।
- যৌনবাহিত সংক্রমণের ফলে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
- এইচআইভি পরীক্ষার (ভিসিটি/ এইচটিসি)পরামর্শ প্রদান
- সিফিলিস
পরীক্ষা কথা বিবেচনা করা।
প্রতিবার যৌনমিলনে সঠিক
নিয়মে কনডম ব্যবহার ঃ
এইচআইভি সহ যৌনরোগের সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর
জন্য, কনডমের সঠিক ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া সমস্ত রোগীর জন্য অপরিহার্য।
- কিভাবে সঠিকভাবে কনডম ব্যবহার করতে হবে তা প্রত্যেক রোগীকে প্রদর্শন করে দেখাতে হবে ।
- যৌন রোগীর জন্য ডিআইসি থেকে কনডম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
সঙ্গী চিহ্নিতকরণ এবং চিকিৎসা প্রদান (সঙ্গীর
ব্যবস্থাপনা/ পার্টনার ম্যানেজমেন্ট)ঃ
সঙ্গীর
লক্ষন থাকুক বা না থাকুক রোগীকে অবশ্যই পার্টনার ম্যানেজমেন্ট এর গুরুত্ব বুঝতে হবে
· লক্ষনবিহীন
সঙ্গী থেকে পুন:রায় সংক্রমণের ঝুঁকি।
· তার
সঙ্গীর জন্য জটিলতার ঝুঁকি।
· পার্টনার
ম্যানেজমেন্ট এর সম্ভাব্য উপায়
হচ্ছে সঙ্গীর চিকিৎসার জন্য
বিশেষ ব্যবস্থা রাখা এবং সঙ্গীকে
চিকিৎসার জন্য ক্লিনিকে আসার
জন্য উৎসাহিত করা
Adapted from Family Health
International/Asia & Pacific Division (2004). Training for clinical
guidelines for sexual health care of MSM & transgender people. Bangrak
Hospital, Bangkok, Thailand.